বৃহস্পতিবার , ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং , বাংলা: ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , হিজরি: ১৬ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

থ্রি নট থ্রি’ রাইফেল !! জিয়াউল হক

থ্রি নট থ্রি’ রাইফেল !! জিয়াউল হক

থ্রি নট থ্রি’ রাইফেল !!

জিয়াউল হক

রফেজ খাঁ’র দশ বেটা-বেটি’র মাঝে হানিফ খাঁ সবচেয়ে বড়। কঁচা নদীর পাড় ঘেঁষা বোথলা গ্রামে তার জন্ম। রফেজ খাঁর যথেষ্ট পরিমান আবাদি জমি ছিলো। কঁচা নদীর ভাঙ্গনে তার সিংহভাগই নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে।

নিরুপায় রফেজ খাঁ তার কিশোর ছেলেদের নিয়ে কঁচা নদীতে মাছ ধরে কায়ক্লেশে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে।
দেশে তখন গণঅভ্যুত্থান চলছে। তার ঢেউ প্রত্যন্ত গ্রামেও এসে পৌঁছেছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা লঞ্চ যোগে পরের দিন মফস্বলে এলে তার গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাদেক সাহেব সকলকে খবর পড়ে শোনাতেন। রফেজ খাঁ একদিন জানতে পারলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের পরে শেখ সাহেব সারাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন এবং তার অংশ হিসেবে তৎকালিন মহকুমা শহর পিরোজপুরে শেখ সাহেব জনসভা করবেন।
রফেজ খাঁ ঠিক করলেন তিনি তার নৌকায় সাদেক সাহেব সহ গ্রামের কিছু লোককে নিয়ে সভায় যোগ দিবেন। একথা শুনে তার কিশোর ছেলে হানিফ খাঁ বায়না ধরলো, ” বাজান মুই কইলো তোমাগো লগে মিটিং-এ যামু। “
“ম্যালা দূড়ের পোত, তোর যাওনে কাম নাই। “
” না বাজান মুই যামু।”
নিরুপায় হয়ে হানিফ খাঁকে নিতে হলো।
নির্দিষ্ট দিনে নৌকায় চড়ে তারা কঁচা নদীর পথ ধরে প্রথমে ইন্দুরকানি ও বলেশ্বর নদী পথে পিরোজপুরের পুরাতন খেয়া ঘাটে এসো পৌঁছালেন। চারিদিকে লোক আর লোক। সভাস্থলে এসে মঞ্চে সকলের চেয়ে প্রায় এক ফুট উঁচু মানুষটির দিকে চোখ আটকে গেলো হানিফের। একটা বিশেষ কিছু আছে তাঁর কথায় যা সকলকে টানতো। হানিফ শেখ সাহেবের সব কথা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলো।
এরপরে ‘৭০ এর নির্বাচনে হানিফ নৌকার প্রার্থীর হয়ে টিনের চোঙা হাতে সকল মিছিল মিটিং-এ নিয়মিত অংশ নিয়েছে। এরপরে এলো ২৬ মার্চের কালো রাত। হানিফ শুনতে পেলো দেশে যুদ্ধ লেগেছে। তার মন বড়ই উতলা।
রফেজ খাঁ হানিফ ও আরো দুই ছেলেকে নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে গেলো। একরাতে রায়েন্দর তাফালবাড়ি এলাকায় নৌকা নোঙ্গর করে রাত কাটাচ্ছিলেন। সকাল বেলা উঠে হানিফের খোজ পাওয়া গেলো না। তিনি সম্ভাব্য সব যায়গায় খু্ঁজেও হানিফের সন্ধান না পেয়ে বাড়ি চলে এলেন।
হানিফ রায়েন্দাতে নেমে মুক্তিযুদ্ধকালীন সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনের লোকজনের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লেখালো এবং জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করলো।
দেশ স্বাধীন করে হানিফ খাঁ বিজয়ীর বেশে গ্রামে ফিরে এলো।
জীবিকার জন্য মাছ ধরাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিলো। বর্ষার মওসুমে নদীতে মাছ ধরতো, শুকনো মওসুমে দিন মজুরের কাজ করতো।
হানিফের চার সন্তানের মাঝে বড়টির নাম রোকন খাঁ।
অনেক কষ্ট করে হানিফ রোকনকে স্থানীয় হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উপজেলার কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করিয়েছেন। ছেলে তার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যলয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত নিয়োগ পেলো। বাপ-বেটা মহা খুশীতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অফিসে এলেন নিয়োগ পত্র নেয়ার জন্য।
রীতিমতো রোকনকে সিভিল সার্জনের অফিস থেকে সাস্ব্যগত সক্ষমতার সনদ আনতে বলা হলো। তারা সিভিল সার্জনের অফিসে ঢুকে কেরানী আকমল সাহেবকে সার্টিফিকেটের কথা বললেন। কেরানী সাহেবের চোখ ফাইলে নিবিষ্ট। তিনি ইশারায় তাদের বসতে বললেন।
খানিকক্ষন পরে হানিফ খাঁ’র দিকে তাকিয়ে
বললেন, ” তা খরচাপাতি কিছু এনেছেন? “
হানিফ খাঁ যেনো আকাশ থেকে পরলো!
সে তাদের আর্থিক দুরাবস্থার কথা শোনালো এবং সে একজন মুক্তিযোদ্ধা তাও জানালো।
আকমল সাহেব চশমার ফাক গলিয়ে ভ্রুকুটি করে বললেন , ” এই আপনাদের একটা দোষ! কবে কি যুদ্ধ করেছেন, তার সুবিধা এখনো নিতে চান, বাপু। খরচাপাতি দেওয়াতো এখন সিস্টেম হয়ে গেছে।”
হানিফ খাঁর মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠলো। মনেমনে বললেন, “‘৭১ -এ রাজাকার মেরেছি বটে: এগুলোতো আরো বড় রাজাকার। “
তিনি কিছু একটা বলে উঠবেন এমন সময় রোকন তার বাবার হাত চেপে ধরে রুম থেকে বাইরে বেড়িয়ে এলো।
আকমল সাহেবকে বলে এলো তারা লাঞ্চের পরে আসবেন।
রোকনের স্কুলের একজন শিক্ষক রেজাউল সাহেব এই শহরেই আছেন। রোকন তাঁর বাসায় এলো। রোকন ও তার বাবা সবকিছু খুলে বললো।
রেজা সাহেব আকমল সাহেবকে চিনতেন। তিনি আকমল সাহেবের সন্তানদের গৃহশিক্ষক ছিলেন কিছুকাল। আকমল সাহেব গর্ব করে বলতেন, ” স্যার, শিক্ষকতা করে কি করতে পেরেছেন, বলেন? আমি কেরানিগিরি করেও দোতালা ডুপ্লেক্স বাড়ি করেছি, ছেলেকে নামকরা বেসরকারী মেডিকেলে পড়াচ্ছি, আশা আছে শেষ বয়সে ঢাকায় একটি ফ্লাট কিনবো। “
রেজা সাহেব চায়ের কাপে মুখ ডুবিয়ে কেরানী সাহেবের কীর্তির বয়ান শুনতেন।
রেজা সাহেব ফোনে আকমল সাহেবের সাথে কথা বলে ৩০০০ টাকায় রফা করে দিলেন। রোকন ও তার বাবাকে ডাল-ভাত খাইয়ে ৩০০০ টাকার ব্যবস্তা করে দিলেন।
হানিফ খাঁ খেতে খেতে বললো, ” স্যার, মনে ইচ্ছে হয় আর একবার হাতে ৩০৩ রাইফেল নেই, আর একটা যুদ্ধ করি। এই ঘুষখোর ও দূর্নীতিবাজরা ‘৭১ এর রাজাকারের চেয়েও খারাপ।”
রেজা সাহেব অপলক হানিফ খাঁ’র আগুন ঝড়া চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে লেখা বাস্তবে কারো সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়।
লেখকঃ শিক্ষক ,সমাজকর্মী ও লেখক।

এমন আরো খবর:

error: লেখা সংরক্ষিত!